বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা যে কাজটি করে থাকি সাধারনত তা হল পুরো দিনের একটা পরিকল্পনা করে নেয়া। দিনটি কিভাবে কাটাবো, কার কার সাথে দেখা করতে হবে, কি কি কাজ না করলেই নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এতো গেল আমাদের দৈনিক পরিকল্পনা। এছাড়া আমাদের আছে মাসিক কিংবা বার্ষিক পরিকল্পনা। কিছু কিছু পরিকল্পনা আছে কয়েক বছরের জন্য করা। যেমনঃ আগামী চার বছরে ব্যাচেলর পাশ করে তারপর ভাল একটা চাকুরী কিংবা ব্যবসা করা, তারপর বিয়ে করা ইত্যাদি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে আমাদের প্রাণ কতটা ঠুনকো। আমরা মাত্র দুই মিনিটের এক হৃদযন্ত্রের গোলযোগ সহ্য করতে পারি না। আমরা ভুলে যাই যেকোন মুহুর্তে আমরা মৃত্যুর হাতে ধরা পড়ে যেতে পারি। এটা যে কতটা সত্য তা আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারব। কিন্তু হতভাগা আমরা। আমরা চিন্তা করি না। আমরা আল্লাহর দেয়া মস্তিস্ককে ব্যবহার করা ভুলে গেছি।
আমরা অনুসরন করি আমাদের বাসনা আর লালসার। আমি বলছি না যে পরিকল্পণা করা যাবে না; কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় যেন এমন কিছু থাকে যা মৃত্যুর পরে আমাদের উপকারে আসে। আল্লাহ সুবাহানাল্লাহু তা’আলা বলেনঃ “আর আমি তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় কর, তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পুর্বে। কেননা তখন সে বলবে, হে আমার রব, যদি আপনি আমাকে আরো কিছু কাল পর্যন্ত অবকাশ দিতেন, তাহলে আমি দান-সাদকা করতাম। আর সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম”। (সুরা মুনাফিকুনঃ আয়াত ১০)
আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জীবনকাল নির্দিষ্ট। যা এগুবার নয় কিংবা পিছুবারও নয়। কিন্তু তা কখন আমরা জানি না। আমরা শুধু এটুকু জানি তা যেকোন সময় হতে পারে যেকোন স্থানে হতে পারে। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।
এক ব্যক্তি শহরের একটি শপিং মলের মেরামত কাজ করছিল। সাত তলা উচুত থেকে হঠাত করেই পা ফসকে সে পড়ে গেল। লোকজন তার পড়ে যাওয়ার শব্দ আর চিতকার শুনে জড়ো হল। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে সে সুস্থ মানুষের মত উঠে দাড়াল। লোকজন তার উঠে দাঁড়ানো দেখে খুশিতে হাততালি দিল। সে নিজেও বেশ অবাক হয়ে গেল। এত উচু থেকে পড়েও যে সে বেঁচে গেল তা চিন্তা করেই সে অবাক। তাই সে ঘোষনা দিল সবাইকে ছোটোখাট একটা পার্টি খাওয়ানোর। সে রাস্তার অপর পাশের খাবার দোকানে গেল। কিছু নানা রকমের খাবার কিনে ফিরে আসার সময় রাস্তা পার হতে গিয়ে একটি চলন্ত বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে ততখনাত ওখানেই মারা গেল।
কি বিচিত্র আমাদের চিন্তাধারা। আমরা যখন কোন বিপদে পড়ি তখন খুব করে আল্লাহকে ডাকতে থাকি। যখন বিপদ পার হয়ে যায়, অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টিতে মনে হয় বিপদ চলে গেছে তখন পুরো ব্যাপারটা আমাদের কাছে আমোদ আর মজার ব্যপার হয়ে যায়। ভুমিকম্পের স্ট্যাটাস গুলো দেখলে তাই মনে হয়। যেন ভুমিকম্প একটি মজার ব্যাপার।
“অতঃপর যখন ভীতি আসে তখন তুমি তাদের দেখবে মৃত্যুভয়ে তারা মুর্ছিত ব্যক্তির ন্যায় চক্ষু উল্টিয়ে তোমার দিকে তাকায়। অতঃপর যখন ভীতি চলে যায় তখন তারা সম্পদের লোভে কৃপণ হয়ে শাণিত ভাষায় তোমাদের বিদ্ধ করে”। (সুরা আহযাবঃ আয়াত ১৯)
আসলে আমরা ভুলে যাই সুখ বিনাশী মৃত্যুকে; আর বৈষোয়িক সফলতার পিছু নেই। সত্যিকার অর্থে আমরা ভুলে গেছি সফলতার প্রকৃত মানে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
“প্রতিটি প্রাণি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী”। (সুরা আল-ইমরানঃ আয়াত ১৮৫)
কার কতটি বাড়ি কিংবা কতটি গাড়ি, অথবা কত ভাল পোস্টে চাকুরি, এগুলোই কি সফলতার মাপকাঠি? প্রিয় ভাই ও বোনেরা সেদিন যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফল। এই পৃথিবী আমাদের ধোকা দিচ্ছে। অতএব আমরা প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে আসি। সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেনঃ
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে, যতক্ষন না তোমরা কবরে উপনীত হও। এটা সঙ্গত নয়; তোমরা শিঘ্রই তা জানতে পারবে। আবারো বলছি এটা সঙ্গত নয়; তোমরা শিঘ্রই তা জানতে পারবে”। (সুরা তাকাসুর ১-৪)
আমরা মৃত্যুকে সুদুর পরাহত মনে করা ছেড়ে দেই। কেননা আমরা যেখানেই থাকি না কেন তা আমাদের গ্রাস করবেই।
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর”। (সুরা আন-নিসাঃ আয়াত ৭৮)
আর এই মৃত্যুই আমাদের প্রথম ও শেষ মৃত্যু। এর পর আমাদের আর মরতে হবে না। অসীম সময়ের জন্য আল্লাহ আমাদের বসবাসের স্থান নির্ধারণ করে দিবেন। আর সেই সফল যার বসবাসের স্থান হবে জান্নাত।
“প্রথম মৃত্যুর পর সেখানে তারা আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবেন। তোমার রবের অনুগ্রহস্বরূপ, এটাই তো মহাসাফল্য”। (সুরা দুখানঃ আয়াত ৫৬-৫৭)
আর যদি আমরা আল্লাহকে ভুলে যাই এবং অনুসরণ করি আমাদের বাসনা ও লালসার এবং শয়তানের পথের তাহলে এতে কোনই সন্দেহ নেই যে প্রজ্জলিত অগ্নিই হবে আমাদের ঠিকানা। আর মৃত্যুর সময় থেকেই শুরু হয়ে যাবে আমাদের শাস্তি। আর আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।
“অতঃপর তাদের অবস্থা কেমন হবে যখন ফেরেশতারা তাদের মুখমন্ডল ও পৃষ্ঠদেশসমুহে আঘাত করতে করতে তাদের জীবানাবসান ঘটাবে? এটা এজন্য যে, তারা এমন সব বিষয়ের অনুসরণ করেছে যা আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করেছে এবং তারা তাঁর সন্তোষকে অপছন্দ করেছে। ফলে আল্লাহ তাদের কর্মসমুহ নিস্ফল করে দিয়েছেন” (সুরা মুহাম্মদঃ আয়াত ২৭-২৮)
আমরা জানি যে আমাদের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তারপরও আমরা কি করে একে ভুলে যাই!
“প্রত্যেক প্রানীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর আমি তোমাদের পরীক্ষা করি মন্দ ও ভাল দিয়ে যাচাই করে। আর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন”। (সুরা আম্বিয়াঃ আয়াত ৩৫)
মহান আল্লাহ যেন আমাদের মৃত্যুর পুর্বে পরকালের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে নেবার তৌফিক দেন। আর আমাদের সৎ পথে পরিচালিত করেন।
“হে আমাদের রব, নিশ্চয়ই আমরা শুনেছিলাম একজন আহবানকারীকে, যে ঈমানের দিকে আহবান করে যে, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আন’। তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব আমাদের গুনাহসমুহ ক্ষমা করুন এবং দূর করুন আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি, আর আমাদেরকে মৃত্যু দিন নেককারদের সাথে”। (সুরা আল-ইমরানঃ আয়াত ১৯৩)


06:33
নাজমুল ইসলাম
0 comments:
Post a Comment